Time & Date::
আসসালামু আলাইকুম। ভিজিট করার জন্য আপনাকে স্বাগতম।। এই ওয়েব ব্লগটি সকল মুসলিম ভাইবোনদের জন্য উৎসর্গ করা হলো আলহামদুলিল্লাহ। অনুগ্রহ করে নিয়মিত চোখ রাখুন।। কারও কোনো জিজ্ঞাস্য থাকলে অনুগ্রহ করে নিচে 'যোগাযোগ' লিংকে ক্লিক করে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
Showing posts with label মিলাদ. Show all posts
Showing posts with label মিলাদ. Show all posts

মিলাদ ঊন নবী

মিলাদ ঊন নবী


সংজ্ঞাঃ ‘জন্মের সময়কাল’কে আরবীতে ‘মীলাদ’ বা  ‘মাওলিদ’ বলা হয়। সে হিসাবে ‘মীলাদুন্নবী’-র অর্থ দাঁড়ায় ‘নবীর জন্ম মুহূর্ত’। নবীর জন্মের বিবরণ, কিছু ওয়ায ও নবীর রূহের আগমন কল্পনা করে তার সম্মানে উঠে দাঁড়িয়ে ‘ইয়া নবী সালাম ‘আলায়কা’ বলা ও সবশেষে জিলাপী বিতরণ করা- এই সব মিলিয়ে ‘মীলাদ মাহফিল’ ইসলাম প্রবর্তিত ‘ঈদুল ফিতর’ ও ‘ঈদুল আযহা’-র দু’টি বার্ষিক ঈদ উৎসবের বাইরে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ নামে তৃতীয় আরেকটি ধর্মীয় (?) অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

উৎপত্তিঃ ক্রুসেড বিজেতা মিসরের সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী (৫৩২-৫৮৯ হি.) কর্তৃক নিযুক্ত ইরাকের ‘এরবল’ এলাকার গভর্ণর আবু সাঈদ মুযাফফরুদ্দীন কুকুবুরী (৫৮৬-৬৩০ হি.) সর্বপ্রথম ৬০৪ হিজরীতে মতান্তরে ৬২৫ হিজরীতে মীলাদের প্রচলন ঘটান। যা ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর ৫৯৩ বা ৬১৪ বছর পরে। এই দিন তারা মীলাদুন্নবী উদযাপনের নামে নাচ-গান সহ চরম স্বেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত হ’ত। গভর্ণর নিজে নাচে অংশ নিতেন। আর এই অনুষ্ঠানের সমর্থনে তৎকালীন আলেম সমাজের মধ্যে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন আবুল খাত্ত্বাব ওমর বিন দেহিইয়াহ (৫৪৪-৬৩৩ হি.)। তিনি মীলাদের সমর্থনে বহু জাল ও বানাওয়াট হাদীছ জমা করে বই লেখেন এবং এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা বখশিশ পান। [আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (দারুল ফিকর, ১৯৮৬) পৃ. ১৩/১৩৭।] পরে অন্যান্য আলেমরাও একই পথ ধরেন কিছু সংখ্যক বাদে।

হুকুমঃ ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন একটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত। যা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগে ছিল না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি আমাদের শরী‘আতে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’। [মুসলিম হা/১৭১৮; বুখারী হা/২৬৯৭; মিশকাত হা/১৪০।]

তিনি আরও বলেন, 'তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি করা হ’তে বিরত থাক। নিশ্চয়ই প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই বিদ‘আত ও প্রত্যেক বিদ‘আতই গোমরাহী’। [আবূদাঊদ হা/৪৬০৭; তিরমিযী হা/২৬৭৬; মিশকাত হা/১৬৫।] অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'এবং প্রত্যেক গোমরাহীর পরিণাম জাহান্নাম’। [নাসাঈ হা/১৫৭৮ ‘কিভাবে খুৎবা দিবে’ অনুচ্ছেদ।]

ইমাম মালেক (রহঃ) স্বীয় ছাত্র ইমাম শাফেঈকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীদের সময়ে যেসব বিষয় ‘দ্বীন’ হিসাবে গৃহীত ছিল না, বর্তমান কালেও তা ‘দ্বীন’ হিসাবে গৃহীত হবে না। যে ব্যক্তি ধর্মের নামে ইসলামে কোন নতুন প্রথা চালু করল, অতঃপর তাকে ভাল কাজ বা ‘বিদ‘আতে হাসানাহ’ বলে রায়  দিল, সে ধারণা  করল  যে, আল্লাহর  রাসূল  (ছাঃ) স্বীয় রিসালাতের দায়িত্ব পালনে খেয়ানত করেছেন’। [আবুবকর আল-জাযায়েরী, (মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়) আল-ইনছাফ ৩২ পৃ.। ]

মীলাদ বিদ‘আত হওয়ার ব্যাপারে চার মাযহাবের ঐক্যমত : ‘আল-ক্বাওলুল মু‘তামাদ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, চার মাযহাবের সেরা বিদ্বানগণ সর্বসম্মতভাবে প্রচলিত মীলাদ অনুষ্ঠান বিদ‘আত হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। তাঁরা বলেন, এরবলের গভর্ণর কুকুবুরী এই বিদ‘আতের হোতা। তিনি তার আমলের আলেমদেরকে মীলাদের পক্ষে মিথ্যা হাদীছ তৈরী করার ও ভিত্তিহীন ক্বিয়াস করার হুকুম জারী করেছিলেন। [মীলাদুন্নবী ৩৫ পৃ.; ইবনু তায়মিয়াহ, ইক্বতিযাউছ ছিরাত্বিল মুস্তাক্বীম (১ম সংস্করণ : ১৪০৪ হি./১৯৮৪ খৃ.) ৫১ পৃ.। ]

উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরাম : মুজাদ্দিদে আলফে ছানী শায়খ আহমাদ সারহিন্দী, আল্লামা হায়াত সিন্ধী, রশীদ আহমাদ গাংগোহী, আশরাফ আলী থানভী, মাহমূদুল হাসান দেউবন্দী, আহমাদ আলী সাহারানপুরী প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম ছাড়াও আহলেহাদীছ বিদ্বানগণ সকলে এক বাক্যে প্রচলিত মীলাদ অনুষ্ঠানকে বিদ‘আত ও গুনাহের কাজ বলেছেন (মীলাদুন্নবী ৩২-৩৩ পৃ.)।

রাসূল (ছাঃ)-এর জন্ম-মৃত্যুর সঠিক তারিখ : জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব মতে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঠিক জন্মদিবস হয় ৯ই রবীউল আউয়াল সোমবার। ১লা রবীউল আউয়াল সোমবার তাঁর মৃত্যুদিবস। [রাসূল (ছাঃ সীরাতুর ) ৩য় মুদ্রণ ৫৬ পৃ.।] অথচ ১২ই রবীউল আউয়াল তাঁর জন্মবার্ষিকী বা ‘মীলাদুন্নবী’র অনুষ্ঠান করা হচ্ছে।

একটি সাফাইঃ মীলাদ উদযাপনকারীরা বলে থাকেন যে, মীলাদ বিদ‘আত হ’লেও তা ‘বিদ‘আতে হাসানাহ’। অতএব জায়েয তো বটেই বরং করলে ছওয়াব আছে। কারণ এর মাধ্যমে মানুষকে কিছু ওয়ায শুনানো যায়। অথচ ওয়াযের নামে সব ভিত্তিহীন কাহিনী শুনানো হয় ও সুরেলা কণ্ঠে সমস্বরে দরূদের নামে আরবী-ফারসী-উর্দূ-বাংলায় গান গাওয়া হয়। সবচেয়ে বড় কথা হ’ল বিদ‘আতী অনুষ্ঠান করে নেকী অর্জনের স্বপ্ন দেখা দুঃস্বপ্ন মাত্র। হাড়ি ভর্তি গো-চেনায় এক কাপ দুধ ঢাললে যেমন তা পানযোগ্য থাকে না, তেমনি বিদ‘আতী অনুষ্ঠানের কোন নেক আমলই আল্লাহর নিকট কবুল হয় না। তাছাড়া বিদ‘আতকে ভাল ও মন্দ দু’ভাগে ভাগ করাই আরেকটি বিদ‘আত।

ক্বিয়াম প্রথা : সপ্তম শতাব্দী হিজরীতে মীলাদ প্রথা চালু হওয়ার প্রায় এক শতাব্দীকাল পরে আল্লামা তাক্বিউদ্দীন সুবকী (৬৮৩-৭৫৬ হি.) কর্তৃক ক্বিয়াম প্রথার প্রচলন ঘটে বলে কথিত আছে। [আবু ছাঈদ মোহাম্মাদ, মিলাদ মাহফিল (ঢাকা ১৯৬৬), ১৭ পৃ.।] তবে এর সঠিক তারিখ ও আবিষ্কর্তার নাম জানা যায় না। [তাজুদ্দীন সুবকী, তাবাক্বাতু শাফেঈয়াহ কুবরা (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ, তাবি, ১৩২২ হি. ছাপা হ’তে ফটোকৃত) ৬/১৭৪।]

এদেশে দু’ধরনের মীলাদ চালু আছে। একটি ক্বিয়ামী, অন্যটি বে-ক্বিয়ামী। ক্বিয়ামীদের যুক্তি হ’ল, তারা রাসূল (ছাঃ)-এর ‘সম্মানে’ উঠে দাঁড়িয়ে থাকেন। এর দ্বারা তাদের ধারণা যদি এই হয় যে, মীলাদের মাহফিলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর রূহ মুবারক হাযির হয়ে থাকে, তবে এই ধারণা সর্বসম্মতভাবে কুফরী। হানাফী মাযহাবের কিতাব ‘ফাতাওয়া বায্যাযিয়া’তে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, মৃত ব্যক্তিদের রূহ হাযির হয়ে থাকে, জেনে রাখ, সে ব্যক্তি কুফরী করল’। [মুহাম্মাদ জুনাগড়ী, (মউ, ইউ পি ১৯৬৭) মীলাদে মুহাম্মাদী ২৫, ২৯ পৃ.।] অনুরূপভাবে ‘তুহফাতুল কুযাত’ কিতাবে বলা হয়েছে, ‘যারা ধারণা করে যে, মীলাদের মজলিসগুলিতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর রূহ মুবারক হাযির হয়ে থাকে, তাদের এই ধারণা স্পষ্ট শিরক’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় জীবদ্দশায় তাঁর সম্মানার্থে উঠে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর ধমকি প্রদান করেছেন। [তিরমিযী হা/২৭৫৫; আবূদাঊদ হা/৫২২৯; মিশকাত হা/৪৬৯৯ ‘আদাব’ অধ্যায়।] অথচ মৃত্যুর পর তাঁরই কাল্পনিক রূহের সম্মানে দাঁড়ানোর উদ্ভট যুক্তি ধোপে টেকে কি? আর একই সাথে লাখো মীলাদের মজলিসে হাযির হওয়া কারু পক্ষে সম্ভব কি?

মীলাদ অনুষ্ঠানে প্রচারিত বানাওয়াট হাদীছ ও গল্পসমূহঃ
(১) ‘(হে মুহাম্মাদ!) আপনি না হ’লে আসমান-যমীন কিছুই সৃষ্টি করতাম না’। [দায়লামী, সিলসিলা যঈফাহ হা/২৮২।]
(২) ‘আমি আল্লাহর নূর হ’তে সৃষ্ট এবং মুমিনগণ আমার নূর হ’তে’।
(৩) ‘নূরে মুহাম্মাদী’ হ’তেই আরশ-কুরসী, জান্নাত-জাহান্নাম, আসমান-যমীন সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে’। [আজলূনী, কাশফুল খাফা হা/৮২৭, সনদ বিহীন।]
(৪) আদম (আঃ) ভুল স্বীকার করার পরে মুহাম্মাদের দোহাই দিয়ে ক্ষমা চান। তাকে বলা হ’ল তুমি এ নাম কিভাবে জানলে? তিনি বললেন, আমি উপরে তাকিয়ে দেখি আপনার আরশের খুঁটিতে ঐ নামটি সহ লেখা আছে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। তাই আমি তার দোহাই দিয়ে আপনার নিকট ক্ষমা চেয়েছি। আল্লাহ বললেন, কথা তুমি সত্য বলেছ। তার দোহাই দিয়ে তুমি ক্ষমা চাও। আমি ক্ষমা করে দিব। যদি মুহাম্মাদ না হ’ত, তাহ’লে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না’। [যঈফাহ হা/২৫।]
(৫) আসমান-যমীন সৃষ্টির দু’হাযার বছর পূর্বে জান্নাতের দরজায় লেখা ছিল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এবং আলী মুহাম্মাদের ভাই’। [যঈফাহ হা/৪৯০১।]
(৬) মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর সঙ্গে (ক্বিয়ামতের দিন) তাঁর আরশে বসবেন’। [সাবাঈ, আস-সুন্নাহ ৮৬ পৃ.।]
(৭) রাসূল (ছাঃ)-এর জন্মের খবরে খুশী হয়ে আঙ্গুল উঁচু করার কারণে ও সংবাদ দানকারিণী দাসী ছুওয়াইবাকে মুক্ত করার কারণে জাহান্নামে আবু লাহাবের হাতের মধ্যেকার দু’টি আঙ্গুল পুড়বে না। এছাড়াও প্রতি সোমবার রাসূল (ছাঃ)-এর জন্ম দিবসে আবু লাহাবের জাহান্নামের শাস্তি মওকূফ করা হবে বলে হযরত আববাস (রাঃ)-এর নামে প্রচলিত তাঁর কাফের অবস্থার একটি স্বপ্নের বর্ণনা।
(৮) মা আমেনার প্রসবকালে জান্নাত হ’তে বিবি মরিয়ম, বিবি আসিয়া,  মা  হাজেরা  সকলে  দুনিয়ায়  নেমে এসে সবার
অলক্ষ্যে ধাত্রীর কাজ করেন।
(৯) নবীর জন্ম মুহূর্তে কা‘বার প্রতিমাগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে, রোমের অগ্নি উপাসকদের ‘শিখা অনির্বাণ’গুলো দপ করে নিভে যায়। বাতাসের গতি, নদীর প্রবাহ, সূর্যের আলো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ইত্যাদি...। [সবই ভিত্তিহীন। দ্র. সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) ৩য় মুদ্রণ ৫৬-৫৭ পৃ.।]
এছাড়াও বলা হয়ে থাকে যে, (ক) ‘আদম সৃষ্টির সত্তর হাযার বছর পূর্বে আল্লাহ তাঁর নূর হ’তে মুহাম্মাদের নূরকে সৃষ্টি করে আরশে মু‘আল্লায় লটকিয়ে রাখেন’।
(খ) ‘আদম সৃষ্টি হয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে জ্যোতির্ময় নক্ষত্ররূপে মুহাম্মাদের নূর অবলোকন করে মুগ্ধ হন’।
(গ) ‘মে‘রাজের সময় আল্লাহ পাক তাঁর নবীকে জুতা সহ আরশে আরোহন করতে বলেন, যাতে আরশের গৌরব বৃদ্ধি পায়’ (নাঊযুবিল্লাহ)।

উপরের বিষয়গুলি সবই বানাওয়াট।
মীলাদ উদযাপনকারী ভাইদের এই সব মিথ্যা ও জাল হাদীছ বর্ণনার দুঃসাহস দেখলে শরীর শিউরে ওঠে। যেখানে আল্লাহর নবী (ছাঃ) হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক আমার নামে মিথ্যা হাদীছ রটনা করে, সে জাহান্নামে তার ঘর তৈরী করুক’। [বুখারী হা/১০৭; মিশকাত হা/১৯৮।]

তিনি আরও বলেন, 'তোমরা আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেভাবে নাছারাগণ ঈসা (আঃ) সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করেছে।... বরং তোমরা বল যে, আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল’। [বুখারী হা/৩৪৪৫; মিশকাত হা/৪৮৯৭।]

যেখানে আল্লাহপাক এরশাদ করছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই, তার পিছনে ছুটো না। নিশ্চয়ই তোমার কান, চোখ ও হৃদয় সবকিছু (ক্বিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৩৬)। সেখানে এই সব লোকেরা কেউবা জেনে শুনে কেউবা অন্যের কাছে শুনে ভিত্তিহীন সব কল্পকথা ওয়াযের নামে মীলাদের মজলিসে চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাবতেও অবাক লাগে।

‘নূরে মুহাম্মাদী’র আক্বীদা মূলতঃ অগ্নি উপাসক ও হিন্দুদের অদ্বৈতবাদী ও সর্বেশ্বরবাদী আক্বীদার নামান্তর। যাদের দৃষ্টিতে স্রষ্টা ও সৃষ্টিতে কোন পার্থক্য নেই। এরা ‘আহাদ’ ও ‘আহমাদের’ মধ্যে ‘মীমের’ পর্দা ছাড়া আর কোন পার্থক্য দেখতে পায় না। তথাকথিত মা‘রেফাতী পীরদের মুরীদ হ’লে নাকি মীলাদের মজলিসে সরাসরি রাসূল (ছাঃ)-এর জীবন্ত চেহারা দেখা যায়। এই সব কুফরী দর্শন ও আক্বীদা প্রচারের মোক্ষম সুযোগ হ’ল মীলাদের মজলিসগুলো। বর্তমানে সরকারী ও বেসরকারী রেডিও-টিভিতেও চলছে যার জয়জয়কার। এগুলির বিরুদ্ধে সাধ্যমত প্রচার করুন এবং এগুলি থেকে চোখ-কান বন্ধ রাখুন ও পরিবারকে রক্ষা করুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। (আমীন!)
Read More

মিলাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মিলাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস


প্রচলিত মিলাদের প্রবর্তক হলেন, ইরাকের মুসল নগরীর শাসনকর্তা মুজাফফর উদ্দিন কুকুবুরী। তিনি ক্রুসেদ যোদ্ধাদের থেকে অনেক এলাকা জয় করে তার শাসনাধীনে নিয়ে আসেন। সেই খুশিতে তার নির্দেশে আবুল খাত্তাব উমর নামক জনৈক আলেম ৬০৪ হিজরীতে মিলাদ-ঊন-নবী উৎসবের সূচনা করেন। ইনি ইবনে দাহিয়া নামে স্মধিক পরিচিত। এদের চরিত্র তেমন ভালো ছিল না। সুলতান মুজাফফর ছিলেন একজন অপব্যয়ী শাসক। রাষ্ট্রীয় অর্থ তিনি সীমাহীনভাবে খরচ করতেন। এ ব্যাপারে ঐতিহাসিক ও ইমাম যাহাবী (রঃ) বলেন, তার মিলাদ মাহফিল কাহিনী ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়। মিলাদ অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য ইরাকের প্রত্যন্ত অঞ্চল হথে ও আলজিরিয়া হতে প্রচুর লোকের আগমন ঘটতো। মিলাদের দিন তার ও তার স্ত্রীর জন্য সুরম্য কাঠের গম্বুজাকৃতির তাবু তৈরি করা হতো। সেখানে নবীর গুণগান্সহ গানবাজনা ও বিভিন্ন খেলাধুলার আসর জমতো। মুজাফফর প্রত্যহ সেখানে আসতেন এবং অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। অনুষ্ঠান কয়েকদিন যাবত চলতো। অসংখ্য পশু জবাই করে আগত ব্যক্তিদের আহারের ব্যবস্থা করা হতো। তিনি এ উপলক্ষে তিন লাখ দিনার বাজেট পেশ করতেন। ফকির দরবেশদের জন্য দু’ লাখ এবং অতিথিদের জন্য এক লাখ দিনার। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা করেন, আমি দস্তরখানায় বিশেষ এক প্রজাতির একশত ঘোড়া, পাঁচ হাজার বকরীর মাথা, দশ হাজার মুরগী, এক লাখ গামলা এবং তিন হাজার হালুয়ার পাত্র গণনা করেছি। এরপর ইমাম যাহাবী (রঃ) বলেন বিষয়টি আমার কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। এ ব্যাপারে ইমাম আহমদ বিন মোহাম্মদ মিসরী (রঃ) বলেন, তিনি বাদশাহ ছিলেন। সমকালীন উলামাদেরকে তিনি নিজ নিজ ইজতেহাদ অনুযায়ী আমল করার নির্দেশ দিতেন। চার ইমামদের অনুসরণ করতেও নিষেধ করতেন। ফলে এক শ্রেণীর আলেম তার দিকে ঝুকে পড়ে। তিনি রবিউল আউয়াল মাসে মিলাদ শরীফের আয়োজন করতেন। তিনিই প্রথম বাদশাহ যিনি মিলাদের প্রবর্তন করেন। পরবর্তিকালে তার অনুসরণ করে অনেকেই মিলাদ-ঊন-নবী উৎসব করা শুরু করলো। আস্তে আস্তে সেটা আমাদের এখনকার মিলাদে পরিণত হয়। আর আমরাও সেটাকে অতিশয় সওয়াবের কাজ মনে করে মিলাদ উৎযাপন করছি। (বিস্তারিত দেখুনঃ আল মিনহাজুল ওয়াজিহ, পৃঃ ১৬২)

অতএব বোঝা গেল, প্রচলিত মিলাদের প্রবর্তক বাদশাহ মুজাফফর ইসলামি বিধিবিধানের গুরুত্ব দিতেন না। এদের চরিত্র তেমন ভালো ছিলো না। গানবাজনায় লিপ্ত হতেন। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ করে মিলাদের আয়োজন করতেন। আলেমদেরকে চাপ, প্রলোভন দিয়ে ইচ্ছামতো ব্যবহার করতেন।

রাসুল (সাঃ) বা অন্য কারো জন্মোৎসব পালন করা জায়েজ নয় বরং তা বারণ  করা অবশ্য কর্তব্য। কেননা এটি ধর্মে নব প্রবর্তিত একটি বিদ’আত। রাসুল (সাঃ) কখনো এ কাজ করেন নি। তার নিজের বা তার পূর্ববর্তি কোনো নবী বা তার কোনো স্ত্রী, কণ্যা, আত্মীয় অথবা কোনো সাহাবীর জন্মদিন পালনের কোনো নির্দেশ তিনি দেননি। খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম বা তাদের সঠিক অনুসারী তাবেয়ীনদের মধ্যেও কেউই এমন কাজ করেন নি। এমনকি আমাদের পূর্ববর্তি অধিকতর উত্তম যুগে কোনো আলেমও এ কাজ করেন নি। অথচ তারা সুন্নাহ সম্পর্কে আমাদের চেয়ে অধিকতর জ্ঞান রাখতেন এবং আল্লাহর রাসুল ও তার শরীয়ত পালনকে সর্বাধিক ভালোবাসতেন। যদি এ কাজটি এমনই সওয়াবের হতো তাহলে তারা আমাদের আগেই তা করতেন।

এ কথা সকলের জানা যে, আমাদের নবী সকল নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ। তিনি সবার চেয়ে অধিকতর পরিপূর্ণভাবে দ্বীনের পয়গাম ও উপদেশবার্তা পৌছিয়েছেন। যদি মিলাদ মাহফিল আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত দ্বীনের অংশ হতো তাহলে তিনি নিশ্চয়ই উম্মতের কাছে বর্ণনা করতেন বা তার সাহাবীগণ তা করতেন। যেহেতু এমন কিছু পাওয়া যায় না অতএব প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের সাথে এই মিলাদ মাহফিলের কোনই সম্পর্ক নেই বরং এটা বিদ’আত যা থেকে রাসুল (সাঃ) তার উম্মতকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। তিনি আরও বলেন, “যে ব্যক্তি এমন আমল করলো যার উপর আমার কোনো নির্দেশ নেই সে আমলটি অগ্রহণযোগ্য” (মুত্তাফাকুন আলাইহি, ৩২৪৩)।

আমি একদিন এক মসজিদের ইমামসাহেবের বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন শবে মিরাজ উপলক্ষে এ রাতে কোনো বিশেষ সালাত, ইবাদত বন্দেগী বা সিয়াম নেই। যদি শবে মিরাজ উপলক্ষে কোণো আমল করা হয় তা বিদ’আত হিসেবেই গণ্য হবে। তার এ বক্তব্য শেষ হতে নাহতেই কয়েকজন শিক্ষিত শ্রেণির মুসল্লী বলে উঠলেন, হুজুর এ কি বলেন! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহাব্বতে এ রাতে কিছু করলে বিদ’আত হবে কেন? প্রশ্নকারী লোকগুলো যে বিভ্রান্ত বা বিদ’আতপন্থী তা কিন্তু নয়। তাদের খারাপ কোনো উদ্দেশ্যও নেই। কিন্তু তারা যা করার ইচ্ছা করেছেন, আসলে তার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে তাদের ধারণাই নেই। অবশ্যই রাসুল (সাঃ)-কে মহব্বত করা ঈমানের অঙ্গ। আর সব ধরণের মহব্বতেই আবেগ থাকে। রাসুলের (সাঃ) মহব্বতেও থাকবে। কিন্তু সেই আবেগ যেন মহব্বতের নীতিমালা লংঘন না করে। সেই আবেগভরা মহাব্বত যেন আল্লাহর রাসুল (সাঃ)-এর আদর্শ ও সুন্নাতের বিরুদ্ধে না যায়। যদি এমনটি হয় তাহলে বুঝতে হবে যে, রাসুল (সাঃ)-কে মহব্বতের নামে শয়তান তাকে ধোঁকায় ফেলেছে। এ কথা মুসলিমদের কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, খৃষ্টানরা বিদ’আতী কাজকর্ম করে ও তাদের নবীর মহব্বতে বাড়াবাড়ি করে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। এ কথা আল কোর’আনে যেমন এসেছে তেমনি হাদিসেও আলোচনা করা হয়েছে।
Read More